দুপুরে গরুখালির মাঠে ধান নিড়াতে গিয়ে লাশটা চোখে পড়ে মজিদ ব্যাপারির। গরুখালির মাঠেই আলীমেয়েলির ঘর। নিজের লিঙ্গ পরিচয় না থাকার কারণে গাঁয়ের ভেতরের আশ্রয়টুকু হারিয়ে এই দিগন্তজোড়া মাঠের পশ্চিমপাশে প্রসস্ত এক ডিবির কেন্দ্রে বাঁশের খুপড়ি বানিয়ে থাকতো সে। সঙ্গী ছিল একপাল ভেড়া। ভেড়াচাষ করেই দিব্যি চলে যেত ওর একার পেট। শুনেছি রাতভর কথাও বলত এই ভেড়াদের সাথে! আরো একটা কাজ নাকি করাত এই ভেড়াদের দিয়ে। এক চাদিফাটা চৈত্রের দুপুরে তার জন্য বিচারও হয়েছে চেয়ারম্যানের উঠোনে। আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলে খবর গেল আলীমেয়েলির বিচার হবে। এর আগেও কয়েকবার ওর বিচার হতে আমি দেখেছি। বয়স কম থাকায় কারণগুলো স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারিনি। একবার যেমন মতুবিল্লাহর বৌয়ের সাথে অতিরিক্ত মেলামেশার কারণে ওর বিচার হয়েছিল। তিনটি ভেড়া সেবার গাঁয়ের কেন্দ্রীয় আহলে হাদিসের মসজিদে দিতে হলো শাস্তিস্বরূপ। গাঁয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদ দুটো– একটি হানাফি মাজহাবের, অন্যটি আহলে হাদিসের। চেয়ারম্যান নিজে আহলে হাদিসের অনুসারী। তবে সেই কারণে নয়। রীতি হলো যার বিচার হবে তার কাছ থেকে প্রাপ্ত জরিমানা তার মাজহাব অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। আলীমেয়েলির নিজস্ব কোনো মাজহাব না থাকলেও তারা বাবা ছিলেন আহলে হাদিস জামাতের অনুসারী। অনুসারী মানে নামাজ তেমন পড়ত না, দুই ঈদে বা কালেভদ্রে পড়লে আহলে হাদিসের মসজিদেই পড়তো, তাও বোধহয় মসজিদটা বাড়ির কাছে হওয়াতে। সেদিন বিচারে চেয়ারম্যানের কাছে অনুমতি নিয়ে আহলে হাদিসের আমির হাফিজ মোল্লা অতি উৎসাহে পায়ের জুতোজোড়া দুহাতে নিয়ে আলীমেয়েলিকে জুতোপেটা করতে উদ্যত হন। অমনি আলীমেয়েলি চেয়ারম্যানের দিকে ছুটে যায়; আকুতি-মিনতি জানায়– ‘চাচা, পায়ি পড়ি, আপনি নিজি আমাকে যেতো ইচ্ছা হয় পিটান, এই গাঁয়ির যে কেউ আমাকে জুতুপিটা করুক। মারতি মারতি মেরি ফেলুক, পিটের চামড়া তুলি নিক; কেন্ত এই ভ- শয়তানটা যেনে আমার গায়ি হাত না তোলে। তালি কেন্ত আগুন জ্বলি যাবে চাচা!’ বলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে আলীমেয়েলি। আমরা সকলে ওর এই রূপ দেখে ভয় পেয়ে কয়েক-পা পিছিয়ে আসি। আমাদের সেকেন্ড স্যার পেছন থেকে কাকে যেন বলেন, ‘একাত্তরের ময়দানে উর এই রূপ আমি দেকিচি! সেদিন ও না থাকলি আমাদের ক্যাম্পের একজুনাও বাঁচতুক না।’ চেয়ারম্যান চাচা কিছু বলার আগেই ছ্যান্ডেল ফেলে সরে দাঁড়ায় হাফিজ মোল্লা। এরপর আর কেউ সেদিন আলীমেয়েলিকে মারতে যায়নি।
ঘটনার দিনসাতেক পর গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল মতুবিল্লার বৌ। কেউ কেউ বললো, মতু নাকি খুন করে আড়ার সাথে টাঙিয়ে রেখেছে। ঐ বলা পর্যন্তই; প্রমাণ করবে কে? তাছাড়া মতু যেভাবে মারধর করতো তাতে আত্মহত্যা করাটাও অস্বাভাবিক ছিল না। আগের বউটাও তো মতুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে একদিন অন্ধকারে বর্ডার টপকাতে গিয়ে মারা পড়ল বিএসএফের গুলিতে। মতুর এই বউয়ের দাফন হওয়ার দিন সাতেকের মাথায় এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবা মাকে বলছিলেন, ‘গরুস্তানে দেখলাম বিল্লার বৌর কবরের পাশে দাঁড়ি আলীমেয়েলি হাউমাউ কইরি কাঁদচি।’
‘উরা সই পাতিলো। আলীকে একদিন কাঁঠাল খেইতি দিলি ও না খেইয়ি বুলল একটা বাটিত করি দেও সইকে নি খাবো। সই কাঁঠাল খেইতি বেজায় পছন্দ করে।’ মা জবাব দিলেন বাবাকে।
আমরা স্কুল থেকে ছুট দিলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে। পৌঁছে দেখি আলীমেয়েলির বিচার চলছে। চেয়ারম্যান রহিমবুতা টিউবওয়েলের পাশে বড় করে একটা গর্ত করে মাঝখানে চেয়ার পেতে বসেছেন। বুকপর্যন্ত পানি। মৃদু বাতাসে পানিতে হালকা কাঁপুনি হলে ওর গরুর মতো বিশাল সাইজের ভুড়িটা মনে হচ্ছে হচ্ছে পানির সাথে সাথে টোল খাচ্ছে। খুব গরম পড়লে তিনি টিউবওয়েলের পানি দিয়ে গর্তটা ভরাট করে একটা চেয়ার পেতে বসে থাকেন। লোকজন আসলে ওখান থেকেই আলাপ সারেন।
‘অবুলা ভেড়া দি গাঁয়ির রাখালদের…ছি ছি…মুখেও আনা যায় না। তুই মানুষ না আমরা জানি, একুন দেখছি তোকে পশুও বুলা যাবে না!’ পানির মধ্যে বসা থেকে কথাগুলো বলছিলেন চেয়ারম্যান চাচা। ‘আর কুনো মুনিষকে যেনে তোর বাড়ির দিক যেইতি না দেখি। ফের কুনো অভিযোগ উঠলি গাঁছাড়া তো করিছিই, এবার মাঠছাড়াও করবু তোকে।’ এই বলে চেয়ারম্যান সাজা হিসেবে ঘোষণা দিলেন, ‘এবার আর ভেড়া না, পাঁচ হাজার ট্যাকা দিবি। যেতটা ভেড়া বেচতি হয় বেচবি। মসজিদের ছাদঢালাই থেমি আছে ট্যাকার অভাবে। একটা খাটুলিও কিনতি হবে।’ এভাবে হুটহাট নালিশে আলীমেয়েলির ভেড়ার সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় নেই হয়ে গিয়েছিল।
আলীমেয়েলিকে নিয়ে শেষ ঝামেলাটা হয়েছিল বছর দুয়েক আগে। সেদিন জুম্মার নামাজে কেউ একজন হঠাত লক্ষ্য করে পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে আলীমেয়েলি। জামাত শেষ হতে না হতেই শুরু হয় হৈচৈ। সবাই মোটামুটি একমত যে ওর মসজিদে ওঠা উচিত হয়নি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে একজন প্রশ্ন করে বসে, ‘মসজিদে উঠলি দোষ কি? আলীমেয়েলি হিজড়ি বুলি যে মজ্জিদে উঠতি পারবি না?’ প্রশ্ন যখন উঠেছে তখন সবার দৃষ্টি চলে যায় ইমামের দিকে। হানাফি মসজিদে পাশের গ্রাম থেকে এক পেশাদার ইমাম এসে নামাজ পড়িয়ে যান। হাফিজ মোল্লার পেছনে দাঁড়িয়ে যে আলীমেয়েলি নামাজ পড়বে না সেটা আমাদের সকলেরই জানা। ইমাম একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘হিজড়িদের নি পবিত্র আল কুরআনে খুব স্পষ্ট করি কিছু আছে বুলি আমি জানি নি। এ-নি সুনানে বায়হাকির একটা হাদিস আছে। সেকিনে হযরত আলী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এ বিষয়ে জানতি চালি নবীজী লিঙ্গ দেখি সিদ্ধান্ত নিয়ার পরামর্শ দেন। আর বুঝা না গেলি মেয়িমানুষ বুলি ধরি নিতি বলেন। সেই মুতাবেক তাকে আমলও করতি হবে। তার মানে, হিজড়িরা নামাজ, রুজা ও পদ্দা করবি নি¤œাঙ্গ অনুযায়ী। মরিগেলি তাদের জানাজাও হবে।’ ইমাম কথা শেষ করা মাত্রই জনতার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আলীমেয়েলির যৌনাঙ্গের দিকে। উত্তেজিত জনতার সিদ্ধান্তে লোকজনের সামনেই তাকে উলঙ্গ করা হলো। একে একে মুসল্লিরা নিজের চোখে দেখলেন এবং জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ইমামের দিকে তাকালেন। ইমাম বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘বুঝা মুশকিলই। মনে হচ্ছি নারী-পুরুষ উভয়ের যৌনাঙ্গই আছে।’
‘তালি কি হুজুর মসজিদে উঠতি পারবি?’ একদল প্রশ্ন করে।
‘তা কি করি হবে? উর তো মেয়িমানষের ওটা আছে।’ আরেকদল উত্তর দেয়।
‘আমার মনে হয়, গাঁয়ির পুরুষ মানুষ যেকুন সেটা জেনি গেল, তেকুন আর ওর বেপর্দা হয়ি পুরুষ মানুষের সাথে মসজিদে উঠা ঠিক হবে না।’ ইমাম উত্তর করেন।
‘তালি তো ওর পুরুষ মানুষের সামনে মেয়িছেলির মতো পর্দা করা উচিত, শালিনভাবে চলা উচিত?’ একদল প্রশ্ন করে।
‘শুধু পুরুষ মানুষ না, গাঁয়ির মহিলাদের সাথেও ওর অবাধ মিলামিশা কি ঠিক হবে? উর তো পুরুষাঙ্গ আছে? হোক ছোট, ভোতা; আছে তো?’ অন্যদল পাল্টা প্রশ্ন করে।
‘এমন হলি মেয়ি মানুষের সাথেও মিলামিশাতে শালীন হতি হবে। নারী যেমুন পর-পুরুষের সামনে বেপর্দা হতি পারে না, তেমনি পুরুষ মানুষও পরস্ত্রীর সাথে অবাধ মিলামিশা করতি পারে না।’ ইমাম কৌশলে উত্তর করেন।
মসজিদে উঠে নিজের সর্বনাশই ডেকে আনে আলীমেয়েলি। এরপর আর সে ধুপধাপ কারো বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। রাস্তাঘাটে পুরুষ মানুষের সাথে গল্পগুজবও করতে পারে না। গ্রামের দৃশ্যত ধর্মীয় অনুশাসনের ভেতর একরকম গৃহবন্দী হয়ে পড়ে সে। আমাদের বাড়ি মাঝেমধ্যে রাতের অন্ধকারে দেখতাম আসতে। আলীমেয়েলি গোলাঘরের আড়ালে এসে বসতো। মা তরকারি দিয়ে একথাল ভাত নিয়ে ওর হাতে দিলে ও চুপ করে খেতো। দু’জনে আর আগের মতো কথা বলতো না। আমি অনেকদিন দেখেছি মা আর আলীমেয়েলিকে গোলাঘরের আড়ালে চুপচাপ বসে থাকতে। আমরা কেউ বিরক্ত হলে মা বলতেন, ‘ও ছেল বুলিই আমরা নিরাপদে বর্ডার পার হতি পেরিচি। ও সেদিন ছুমুতে বাধা হয়ি না দাঁড়ালি তো হাফিজ মুল্লার লোকজন আমাকে তুলিই নি যাতুক।’
একবছর আগে মা মারা গেলেন। লিভার সিরোসিসে। সন্ধ্যায় জানাজা হলো। আলীমেয়েলিকে দেখেছি, অন্ধকারকে আড়াল বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। জানাজায় অংশ নিতে পারেনি, তবে কবরে মাটি সে দিয়েছে। কেউ তাকে বাধা দেয়নি। দিলেও গ্রাহ্য করতো বলে মনে হয়নি। এরপর অন্ধকারে মিশে গেছে। আর আমি দেখিনি তাকে। একবার ভেবেছিলাম দেখতে যাবো। মা’র কথা ভেবে মনে হয়েছিল আমার খোঁজ নেয়া উচিত। কিন্তু মাঝমাঠে একা মানুষটা থাকে। কত রটনা তাকে নিয়ে, তাই আর সাহস হয়নি।
মৃত্যুর খবরটা যখন আমাদের কানে আসে তখন পশ্চিম পাড়ার সাথে দক্ষিণ পাড়ার পাল্লা হচ্ছে মাঠে। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে আলীমেয়েলির লাশটা তুলে আনা হয়েছে ওর উঠোনে। ঘুমন্ত মানুষের মতো শান্ত হয়ে পড়ে আছে। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু ভালো করে দেখলে সমস্তটা মিলে খুব প্রশান্তি জাগে। শরীরে কোনো ক্ষত নেই। মাথার লম্বা পাতলা চুলগুলো বাঁধা ঝুটি করে। একবার আমাদের উঠোনে এই চুলে তেল দিতে দিতে মা বলেছিলেন, ‘অযতেœ জট পইড়ি গিইচে। যতœ যেকুন নিতি পারিস নি আলী, কেটি ফেললিই তো পারিস?’
‘আমি তো আর একজুনা না, বুউন। শরীল-মনে দু’জুনার বাস।’ আলীমেয়েলি জবাব দিয়েছিল।
‘না কাটিস, এমুন সুন্দর চুল, যতœ নিস।’ মা বলেছিল।
‘নিজিকেই তো একুনো মানতি পারলাম না। ছোটবেলায় মা অভিশাপ দি বুলতুক, মরতি পারিস নি। তুই মরলিই তো আমরা বাাঁচি। একবার তো বাপে আমার মুখে বালিশ চাপা দি ধরিলো। মা মাগীটাই আবার বাঁচালু।’ সেদিন আলীমেয়েলির কথা শুনে ওর প্রতি আমার মায়া জাগে। ভেবেছিলাম ওর সাথে একদিন কথা বলবো। তেমন বিশেষ কিছু না, হয়ত ‘কেমন আছেন?’– এই সামান্য জিজ্ঞাসাটুকুই। ছোট-বড় সকলে তো ওকে তুই-তুকারি করে; আমি না-হয় আপনি করেই বললাম।

‘লাশটা তুলি খাটুলিতে থুলি হয় না, চাচা?’ জিজ্ঞাসা করল একজন।
‘ওর নাপাক শরীল তুললি খাটুলির অবমাননা হবে।’ হাফিজ মোল্লার দৃঢ় উত্তর।
‘ঠিক।’ অন্যজন বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি দেন।
‘হুজুর, কাপনের কাপুড়ের ব্যবস্থা করি?’ অপর একজন জানতে চায়।
‘পুরুষের তিন কাপড়, নারীর পাঁচ। উর জন্যি কয় কাপুড় আনবি?’ হুজুরের বিরক্তিসূচক এই মন্তব্যে লোকটি সরে দাঁড়ায়।
‘হুজুর, শুনিছি, হযরত আলী নাকি এক হিজড়ি মরি গেলি তার সাহাবিদের বুলিলেন, সে যদি পুরুষের সাথে বেশি মিলামিশা করে তালি পুরুষের মতো ব্যবস্থা নিতি, আর যদি মেয়িছেলির সাথে বেশি মিলামিশা করে তালি মেয়িছেলির মতো?’
‘এসব হাদিস সহীহ-না-যয়ীফ বুঝা মুশকিল।’ হাফিজ মোল্লা একটু থেমে যোগ করলেন- ‘তাছাড়া আলীমেয়েলি বিটাছেলি মেয়িলেছি সবার সাথে সুমানতালে মিশতুক। তাই এই নিয়ম উর বেলায় খাটানুও যাবে না।’
‘তালি কি জানাজাটা হবে না; হ্যাগো হাফিজ? হাজার হোক মসুলমানের ঘরে জন্ম?’ শবদেল দাদা জানতে চান। মৃত্যুর খবর শুনে তিনিও এসেছেন।
‘হিজরির আবার জানাজা কি?’ পাল্টা প্রশ্ন দিয়ে হুজুর শবদেল দাদাকে থামিয়ে দেন।
‘আমাদের হুজুর যে বুলিলেন, জানাজা পড়ানু যাবে?’ হানাফি মাজহাবের কেন্দ্রীয় মসজিদের সেক্রেটারি আলম ঘরামী প্রশ্ন তোলেন।
‘তালি তার কাছে নি যাও। জানাজা মানে হলু সাক্ষী দিয়া। এই উভকামী বেনামাজি কাফেরের জানাজা আমি পড়াতি পারবু না।’ রেগে গিয়ে উত্তর করেন হাফিজ মোল্লা। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলীমেয়েলির জানাজা হাফিজ মোল্লার মতো চিহ্নিত রাজাকার না পড়ালেই ভালো। না-হোক জানাজা! আমরা বন্ধুরা নিজেদের ভেতর বলাবলি করি।
‘কুনো সমস্যা নেই। আমরা ব্যবস্থা করবু। তাছাড়া আলীমেয়েলি তো আমাদেরই লোক। একবার নামাজ পড়তি আমাদের মসজিদেও উটিলো।’ আলম ঘরামী সোজা-সরল মানুষ না আমরা জানি। গাঁয়ের সব ধরনের ভালোমন্দ ঘটনাস্থলে তিনি হাজির হোন কোনো-না-কোনো প্যাঁচবুদ্ধি মাথায় এঁটে। তাই তার এই কথা শেষ করার পরও সকলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পরের কথাটি শোনার জন্য। তিনি বললেন- ‘সেটা আমরা করলি কেন্ত আলীমেয়েলির এই ভিটাজমিন হানাফি জামে মজ্জিদে চলি যাবে।’ বোমাটা যে এত জরেসরে ফাঠাবেন সেটা আমাদের আন্দাজ করা ছিল না, ফলে সকলে আরও কিছুক্ষণের জন্য বাক হারিয়ে আলম ঘরামীর দিকে তাকিয়ে থাকল। এরপর আমাদের দৃষ্টি চলে গেল হাফিজ মোল্লার দিকে। তিনি হাসছেন। সচরাচর তাকে আমরা হাসতে দেখি না। হাফিজ মোল্লার হাসি দেখা ডুমুরের ফুল দেখার মতো ঘটনা বলে গ্রামে রটনা আছে। কেউ কেউ বলেন একসময় খুব ফূর্তিবাজ মানুষ ছিলেন তিনি। একাত্তরে পরাজিত হয়ে অকারণ হাসাহাসি ছেড়ে দিয়েছেন। মুরব্বিদের কেউ প্রশ্ন করলে বলেন, মাত্রারিরিক্ত হাসাহাসি আমোদ ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আজ সেই হাফিজ মোল্লা হাসছেন। তার হাসি দেখে অন্যরা থ মেরে গেছে। তাল দিয়ে হাসতে গিয়েও হাসতে পারছে না।
‘ওর লাশ গোরুস্থানেও নিয়া হবে না। খালের পাড়ে একটা গর্ত করি মাটিচাপা দিয়া হবে।’ হাসি থামিয়ে আলম ঘরামীর দিকে তাকিয়ে খুব চড়া কণ্ঠে কথাগুলো বলে হাফিজ মোল্লা। ‘এই জমিনের চুক্তি হয়ি গিচে। এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা।’ বলে আইল ধরে গাঁয়ের পথে হাঁটা দিলেন হাফিজ মোল্লা।
‘তাই বুলি কবরটাও পাবে না?’ উপস্থিত জনতার কাছে প্রশ্ন ছোড়ে শবদেল দাদা।
‘তাতে লাভ কি?’ শবদেল দাদাকে পাল্টা প্রশ্ন করে জটি। ‘ও বেহেসতে মেয়িছেলি-হুর নেবে নাকি বিটাছেলি-হুর? হিজরি-হুর তো আর পাবে না?’ জটির কথায় হো হো করে সকলে হেসে ওঠে। একটু বুঝে নিয়ে শবদেল দাদাও যোগ দেন সেই হাসিতে।
মাসখানেক পরেই আলীমেয়েলির ভিটে গুড়িয়ে শুরু হলো মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার বসানোর কাজ। গাঁয়ের মানুষকে আর এন্টেনা ব্যবহার করতে হবে না। কিংবা কথা বলার আগে প্রতিনিয়ত অনুসন্ধান করতে হবে না আশেপাশের সবচেয়ে উঁচু স্থানটির। গ্রামের টেলি-যোগাযোগের এই বৈপ্লবিক উদ্যোগের চোটে ভেসে যায় আলীমেয়েলির অস্তিত্ব। মোবাইলের ফুল নেটওয়ার্ক-তরঙ্গে ইতিহাসের অনেক ঘটনাই আর আমরা ঠিক ঠিক মনে করতে পারি না।