সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় কয়েকটি ভবন ও হলের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেখে হতবাক না হয়ে উপায় নেই। তালিকায় রয়েছে বিজ্ঞান ও জ্ঞানের অগ্রপথিক আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং অধ্যাপক সত্যেন বসুর নাম, যা সত্যিই আশ্চর্যজনক! এই দুই মহান বিজ্ঞানী শুধু বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদেশেই না, আন্তর্জাতিকভাবেই তাদের কালজয়ী অবদানের জন্য নন্দিত। মুন্সীগঞ্জের সন্তান জগদীশ চন্দ্র বসু বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির পথিকৃৎ এবং উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। অন্যদিকে, সত্যেন বসু তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে করা গবেষণার মাধ্যমে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তত্ত্বের জন্ম দেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। “বোসন” কণার নামকরণ করা হয়েছে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের নামেই।
শুধু এই দুই বিজ্ঞানীই নন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও হলগুলোর নাম পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ, খুলনারই সন্তান আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নাম, যিনি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং রসায়নে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন (মারকিউরাস নাইট্রাইট যৌগের আবিস্কারক)। বাদ পড়েছেন বনলতা সেন ও রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ, যাঁর সাহিত্যিক অবদান বাংলা ভাষার জন্য অমূল্য। আরও বাদ দেওয়া হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের নাম, যাঁরা আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একাত্তর-পরবর্তী কর্মকান্ডের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার না করলেও মানতে হবে যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁকে উপেক্ষা করা মানে জাতির মুক্তির ইতিহাস বিকৃত করা।
নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন শিক্ষার্থীরা এই দাবি তুলেছে? তারা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা এই সিদ্ধান্তকে কতটা যৌক্তিক মনে করেন? সাধারণ জনগণের কাছে এটি কতটা গ্রহণযোগ্য? যখন সচেতন নাগরিক সমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কেন জাতিকে আবার বিভক্ত করার এই অপচেষ্টা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট — নাম পরিবর্তনের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত ছাত্র-জনতার রক্তঝরানো বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী? ইতিহাস আর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের আলোকে বিচার করলে, এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না যে উদ্দেশ্য হলো দেশের গুণী অমুসলিম মানুষদের অর্জনগুলো মুছে ফেলা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধোঁয়াশায় ঢেকে দেওয়া। এটি নতুন প্রজন্মকে ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল, যা দেশের শিক্ষা, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি। নিজেদের অপরিণামদর্শী পরিকল্পনার বাস্তবায়নে উৎসাহী কূপমণ্ডূকরা আমাদের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী, কবি, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদদের নাম মুছে ফেলতে চাইছে – এ যেন বুদ্ধিজীবী-নিধনের আরেক মহাপরিকল্পনা, ধর্মীয় গোড়ামি আর রাজনৈতিক স্বার্থের জালে জড়িয়ে আমাদের অগ্রগতিকে পেছনে টেনে নেওয়ার চেষ্টা।
তবে, এই চেষ্টা হটাৎ চোখে পড়ছে তা নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগে যেমন কিছু গোড়া মানুষ পাকিস্তানিদের সাহায্যে আমাদের দেশে রবীন্দ্রচর্চা বন্ধের চেষ্টা করেছিল, রবীন্দ্রনাথ না কি নজরুল কে বড় কবি তা নিয়ে বালখিল্য বিতর্ক তৈরী করেছিল, তাদের উত্তরসূরীরাই আজকের স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে আবার আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে। এরাই জিন্নাহর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পাকিস্তানিদের থেকে আলাদা হওয়ার প্রকৃত কারণ এড়িয়ে যায়! এদের কাছে বাংলাভাষার কবি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে উর্দূ ভাষার কবি ইকবাল বেশি গুরুত্বপূর্ন; লালনগীতির চেয়ে কাওয়ালি বেশি গ্রহণযোগ্য! এদেরই একাংশ অবজ্ঞাভরে রবীন্দ্রনাথকে “ব্যাটা” বলে গালি দেয়; আবার বিবর্তনবাদ সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান না রেখেই তা “ভুল” বলে রায় দিয়ে বসে। এদের কাছে নারীশিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া হয়ে ওঠেন সমাজ-ধ্বংসের নিয়ামক!!
কদিন আগেই প্রধান উপদেষ্টা বিগত সরকারের কুকর্মের নিদর্শন পরিদর্শনে গিয়ে আইয়ামে জাহেলিয়াতের উদাহরণ টেনেছেন। কিন্তু আসল জাহেলিয়াত শুরু হবে তখনই, যখন কূপমণ্ডূকদের দল শিক্ষাঙ্গনে তাদের পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে। আজ যারা এই অপচেষ্টায় লিপ্ত, তারা শুধু কূপমণ্ডূক নয়, তারা জাতির শত্রু। এদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা নিরাপদ নয়।
আমাদের জাতীয় চরিত্রের শেকড় ধরে টান দেয়া ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবী। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। রাষ্ট্র যদি এদের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।
Leave A Comment