একুশে বইমেলা প্রাঙ্গনের বাইরে, মুক্তচিন্তক অভিজিৎ রায়কে, সবার সামনে খুন করা হয়েছিল এখন থেকে দশ বছর আগে, ফেব্রুয়ারির ২৬, ২০১৫ তে। বিজ্ঞানী, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল লেখক অভিজিৎ রায় মুক্তমনা ব্লগ শুরু করেছিলেন।
যুক্তি, প্রগতি এবং বিজ্ঞানের চর্চাই ছিলো ড. অভিজিৎ রায়ের অপরাধ। চরমপন্থীরা অভিজিতের মগজ খুবলে নিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল, সুবিধাবাদী শাসক চক্র পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছে, হয়তো বা উল্লসিত হয়েছে, নইলে পরবর্তী দুটি বছর প্রগতিশীল মুক্তমনের আরো অনেককে খুন করার যে হত্যা-উৎসব চলছিল তাতে তার বাদ সাধেনি, বরং পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিয়েছে। ২০১৩-২০১৫ তে দ্রুতগতিতে খুন হয়ে গেছেন অসংখ্য ব্লগার, নাট্যকর্মী, পুরোহিত, ধর্মযাজক, শিয়া ইমাম, ধর্মত্যাগী, আহমেদীয়া, দর্জি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, শিল্পী, কার্টুনিস্ট, সংস্কৃতি কর্মী, লেখক, পীর, ধর্মীয় আলেম, সংখ্যালঘু মানুষ, কারারক্ষী, ছাত্র, নাস্তিক, তাঁতী, বাউল, সাংবাদিকসহ অনেকেই। তখনকার শাসকদের আপোষকামিতার শিকার শুধু যে মুক্তমনা মানুষই হয়েছে তাই নয়, ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে যে উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের স্বপ্ন ছিল তা ধীরে ধীরে তিরোহিত হয়েছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে, তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে, একদিকে যেমন দুর্নীতি, অন্যদিকে স্থবির ধর্মজ্ঞানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। ধীরে ধীরে তৃণমূলে অবৈজ্ঞানিক, মধ্যযুগীয়, অজ্ঞানতার কালিমা ছড়িয়েছে, সেটাকে ক্ষমতাবানরা প্রতিহত করেনি, বরং এমন সব আইন স্থাপন করেছে যা কিনা সব সময়ের জন্য দেশটিকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রাখবে, সেখানে মুক্ত চিন্তার কোনো স্থানই থাকবে না।
আমরা তাদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম, বলেছিলাম – ‘তোমাকে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’। তারা যে শুধু সেটা শোনেনি তা নয়, বহু মুক্তচিন্তককে তারা জেলে পুরেছিল, বহুজনকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে নাগরিক মনে ভয়াবহ শঙ্কা ও উদ্বেগ গেঁথে, ত্রাস সৃষ্টি করে শান্তিপ্রিয় মানুষদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাগ্যের পরিহাস আজ তাদেরই দেশ ছাড়তে হচ্ছে, পালিয়ে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে কি আমাদের আনন্দ হচ্ছে? বিন্দুমাত্র না, কারণ আমরা জানতাম ফুটন্ত কড়াই থেকে আমরা আগুনে পড়ব, আর এই আগুন কাউকে ছাড় দেবে না। আর যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছিল, যারা নীরবে বা অস্ফূটে স্বরে মুক্তমনাদের হত্যার নায্যাতা দিয়েছিল, আমরা জানতাম, তারাও সেই আগুন থেকে রক্ষা পাবে না। যারা শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বাক্সের বাইরে ভাবতেই হবে, তারা প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আজ্ঞার প্রতি তাদের অন্ধ আনুগত্য যতই দেখাক না কেন। শিল্প সাহিত্য সৃজনের মূল চালিকাই হলো আনুগত্যের স্খলন। আমরা লক্ষ করছি ধর্মান্ধতার রোষানলে তাদের মিত্ররাও রেহাই পাচ্ছে না।
তাহলে অভিজিতের হত্যার দশ বছর পরে আমরা কোথায় আছি? বিগত সরকারের ইচ্ছাকৃত গড়িমসির জন্য এই হত্যার যথার্থ বিচার হয়নি, এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। অভিজিৎ’দের মতো সত্যিকারের মুক্তবুদ্ধি চর্চার আলোকিত মানুষদের মূ্ল্যায়ণ তো করাই হয়নি, বরং মনে হয়েছে সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ধর্মীয় চরমপন্থীদের সঙ্গে আঁতাত করছিল। মুক্তমনা লেখক গোষ্ঠী ও ব্লগ প্রায় ২৫ বছর ধরে সাধ্যমত নতুন দেশ বাংলাদেশ ও বাঙালিকে জ্ঞান বিজ্ঞানের সাম্ভাব্য সকল শাখায় তাদের চর্চা বজায় রাখতে ও বাঙালিকে এগিয়ে যেতে যথাসম্ভব সহায়তা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীর প্রথমে যুক্তিবাদী চিন্তা চেতনা, ধ্যান ধারণার বিকাশ ঘটছিল, তাকে বিপ্লব বলা চলে। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু ঘটল, বরং অকাল মৃত্যু ঘটানো হলো। এই দশ বছরে জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা এক শ বছর পিছিয়েছি। বাংলাদেশের, বাংলার নাগরিক ছদ্মবেশী জনপ্রতিনিধি হাতে দীর্ঘদিনের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে এখন ধর্মের নেশায় বুঁদ। আজ বাংলাদেশের উন্মত্ত তৌহিদি গোষ্ঠী যখন সামান্য কারণে সাধারণ মানুষের মৃত্যুদণ্ড চায়, কিংবা জাতীয় দিবস পালনে অস্বীকৃতি জানায়, অথবা বাংলাদেশের মূল ভিত্তিগুলোকে স্বীকার করে না, এবং যখন দেখি বর্তমান শাসক উপদেষ্টা বা সেনাবাহিনি সেই কর্মতৎপরতাকে বাধা না দিয়ে বরং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের কারাগারে পুরে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়, তখন বুঝতে হবে এই দেশটিকে নিয়ে যে আশা যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তা দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।
এতো প্রাণ দান করে, এত ত্যাগ করেও দেশকে, দেশের নাগরিকে ধর্মীয় আনুশাসন থেকে আজ রক্ষা করা যায়নি। এখন নতুন ক্ষমতাবান এসেছে নতুন পোষাকে। এরা সেই পুরানো সুবিধাবাদী, শাসক, শোষক, ছদ্মবেশী গণ প্রতিনিধি, ষড়যন্ত্রি। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এখন ফতোয়াবাজদের হাতে বন্দি। জিম্মি হয়ে পড়েছে মৌলবাদি নৃশংসতার, ধর্মীয় স্থবিরতার। দেশের মনুষ কি সত্যিই এমন দেশ চাইছে! দেশের মানুষ কি ধর্মেও থাকবে আবার জিরাফেও থাকবে! ওদিকে পৃথিবীর প্রায় বাকি সব মানুষ বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে আলোর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির পথে, প্রগতির পথে অথচ আমাদের জন্মভূমির মানুষ করছে ঠিক তার উল্টোটা। এমনটা হতে থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো ভয়াবহ রকমের কঠিন হয়ে যাবে। সময়ের সাথে তাল মেলানো আর হবে না। নতুন জ্ঞান তো আমরা সৃষ্টি করতেই পারছি না, এমনকি পৃথিবী আমাদের যে জ্ঞান দিতে চাইছে তারও সদ্ব্যবহার করছি না। কিন্তু এর থেকে মুক্তির উপায় দেশের মানুষদেরই খুঁজে নিতে হবে।
মানুষের মত মানুষ হবার, প্রগতির দিকে এগিয়ে যাবার পথ দেখানো অমর অভিজিৎ রায় এবং তাঁদের মত সব মানুষকে প্রণতি জানাই। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে যারা প্রাণে বেঁচে আছেন, সত্য, সুন্দর এবং আলোর দিকে এগিয়ে যাবার পথ দেখাচ্ছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
যুক্তি আনুক মুক্তি।
Leave A Comment