প্রতিষ্ঠান বনাম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা

কোন সমাজ কতটা প্রগ্রেসিভ সেটা নির্ভর করে সেই সমাজের অন্তর্গত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সামগ্রিক অবস্থানের উপর। মানব সভ্যতার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা টিকে ছিল। সেই সঙ্গে টিকে ছিল এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে ট্যাকল করতে প্রতিষ্ঠানপন্থীদের তৎপরতাও। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠান পন্থী বনাম প্রতিষ্ঠান বিরোধিরা পরষ্পরের মুখোমুখি হয়েছে কিন্ত দিন শেষে জয় হয়েছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার। যে সমাজ এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে হৃষ্ট চিত্তে আলিঙ্গন করতে পারেনি তারা হারিয়ে গেছে। আর যারা টিকে গেছে তারাও এক সময় মুখোমুখি হয়েছে নুতুন কোন বিরোধিতার অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে নুতুন কোন প্রতিষ্ঠানের, তারপর এক সময় সেই প্রতিষ্ঠানও বিরোধিতার সম্মুখিন হয়েছে। এভাবেই এই ক্রমানুকমিক বিরোধিতার উপর ভিত্তি করেই এগিয়েছে সভ্যতা। সমাজকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তাই এই প্রতিষ্ঠান পন্থী বনাম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দ্বন্দের গুরুত্বকে অস্বীকার করবার উপায় নেই। এই দ্বন্দটা থাকবে, আমাদের দেশেও আছে। যেমন আমাদের দেশের রক্ষনশীল সমাজে প্রেম ভালবাসাকে এখনো কিছুটা প্রতিষ্ঠান বিরোধী হিসেবে দেখা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান পন্থীরাও সুযোগ পেলে প্রেমিক যুগলকে কানে ধরিয়ে উঠ বস করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে কাউন্টার করে। ইউটিউবে খুঁজুন, এই টাইপের কানে ধরার ভিডিও অনেক পাবেন। সাম্প্রতিক কালে ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমাদের দেশে এই প্রেম ভালবাসা কেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানটিকে একটা নুতুন মাত্রা দিয়েছে, ফলে কানে ধরে উঠ বস করিয়ে ঈমানী দায়িত্ব পালনের প্রবণতাও কিন্ত ভ্যালেন্টাইন্স ডে আগে পরে কাছাকাছি সময়ে বাড়ে। যাই হোক এবার আসল কথায় আসা যাক। কথা হচ্ছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ম তথা ইসলাম একটা অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ কোন একটি ঘটনাকে ইসলামের নামক এই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বিচার করে। এই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানদন্ডের কারনেই একসময় ব্লগার খুন হলে সে নাস্তিক ছিল কিনা সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে গুলশান হামলার পরও এই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানদন্ডের কারনে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নীরবে নিভৃতে এই হামলাটিকে কোন প্রকারে জাষ্টিফায়াবল বানানোর চেষ্টা করছে অর্থাৎ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠান পন্থী বনাম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দ্বন্দে আপার হ্যান্ডটা এই মুহূর্তে কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠান পন্থীদের কাছে আছে। এটা অবশ্য আপনি পত্র পত্রিকা পড়লে বা টিভির খবর দেখলে খুঁজে পাবেন না, এর জন্য আপনাকে তৃণমুলে যেতে হবে। মনে রাখবেন এই প্রতিষ্ঠান পন্থী বনাম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দ্বন্দে আপনি ঠিক কোন অবস্থানে থাকবেন তার উপরই আক্ষরিক ভাবে নির্ভর করছে আমার আপনার ভবিষ্যৎ। সিদ্ধান্তটা আপনার হাতে।

নর্থ সাউথ সমাচার

নর্থ সাউথের উদ্যোক্তারা জন সেবা করার জন্য ভার্সিটি খোলে নাই, খুলেছে ব্যবসার জন্য। সাম্প্রতিক কালে জঙ্গী সংশ্লিষ্টতায় নর্থসাউথের শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ায় নর্থ সাউথের ইমেজ এখন মারাত্নক সংকটের মুখে। ফলে পুঁজির নিরাপত্তার খাতিরেই তিনারা এখন আক্ষরিক ভাবেই জঙ্গী বিরোধী নানা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করবেন অন্যথায় নামের আগে যতই উত্তর,দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম থাকুক না কেন দিক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নর্থ সাউথ বিরোধী আবহ শক্তিশালী হওয়ায় নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীরাও আবেগ প্রবণ ভাষায় তাদের ভার্সিটির গুণগান করে পোষ্ট লিখছেন। যদিও এতে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না কারন সমস্যার গোঁড়াটা অন্য খানে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন এর গ্রাহক কাঠামোর ধারণাটা ছিল অনেকটাই উচ্চবিত্ত কেন্দ্রীক। ফলে উচ্চ বিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েদেরকে কেন্দ্র করে সেসময় এর ব্রান্ডিং করা হয়েছে। পরবর্তীতে পাশের হার বৃদ্ধির ফলে নর্থ সাউথের মার্কেট এক্সপ্যান্ড হলেও এর উদ্যোক্তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্রান্ডকে সেই অর্থে সাধারন মানুষের কাছে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে প্রতিকুল পরিস্থিতিতে সাধারন মানুষের কাছ থেকে সমর্থন পাবার আশা করাটা তাদের জন্য বাহুল্যই বটে। আপনি এটাকে সমাজে বিদ্যমান শ্রেণী বৈষম্যের এক ধরনের বাহ্যিক প্রকাশ হিসেবেও ধরে নিতে পারেন। রাস্তায় গন্ডগোল তৈরী হলে প্রথম ঢিলটা কিন্ত বড়লোকের প্রাইভেট কারের উপরই গিয়ে পড়ে!!!

নৈতিকতার সংকট

উচ্চবিত্ত পরিবারের “কিউট কিউট” ছেলেদের জঙ্গী তৎপরতায় যুক্ত থাকার সংবাদে আপনারা অনেকেই অবাক হতে পারেন কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে এই ঘটনা নুতুন কিছু নয়। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের জঙ্গী তৎপরতায় যুক্ত থাকার ইতিহাস আগেও ছিল। ওসামা বিন লাদেন নিজেও ছিল সৌদি ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, নাইন এলিভেনে টুইন টাওয়ারে বোমা হামলায় জড়িতদের অধিকাংশই ছিল উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এক সময় সম্ভ্রান্ত জমিদার জোতদারদের সন্তানদেরও সর্ব হারা কমিউনিষ্ট বিপ্লবে নাম লেখানোর ইতিহাস ছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারে জঙ্গী সংশ্লিষ্টতার ঝুঁকিটা বেশি কারণ এই পরিবার গুলোতে নৈতিক শিক্ষার সংকটটা সবচেয়ে বেশি থাকে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকটটা আরো মারাত্নক কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ বড়লোকই ঘুষ দুর্নীতি লুটপাটের মধ্য দিয়ে বড়লোক হয়েছে। সন্তানকে ন্যায়-অন্যায়বোধ, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়ীকতা শেখানোর জন্য যে নৈতিক মেরুদন্ড প্রয়োজন সেই মেরুদন্ড তাদের অধিকাংশরই থাকে না। সন্তানের হাতে ক্রেডিট কার্ড ধরিয়ে দিয়ে উনারা সব দায়িত্ব সারতে চান। ফলে এদের ছেলেমেয়েরা এক ধরনের নৈতিক শিক্ষার শুন্যতা নিয়ে বড় হয়। পিতার অবৈধ অর্থে এরা এক ধরনের হীনমন্যতায়ও ভোগে। পরবর্তীতে এরা যখন জঙ্গীবাদী দের সংস্পর্শে আসে তখন এরা তাদের কাছ থেকে ধর্ম নির্ধারিত মানদন্ডের আলোকে এক ধরনের নৈতিক শিক্ষা পায়। প্রতিটি ঘটনাকে তারা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যাকৃত ধর্ম নির্ধারিত নৈতিকতার আলোকে বিচার করে। এই নিজস্ব ব্যাখ্যাকৃত ধর্ম নির্ধারিত নৈতিকতার কারণেই তাদের কাছে ভিনদেশী নিরীহ নারী পুরুষ হত্যা মোটেও অন্যায় কাজ বলে মনে হয় না কারণ তাদের একটাই পরিচয়, তারা বিধর্মী। যেহেতু তারা তাদের ভাষায় বিধর্মী-কাফেরদের সাথে ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত, ইরাক আফগানিস্তানে আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনে অনেক নিরীহ মুসলমান মারা গেছে তাই পাল্টা আঘাত হিসেবে বিধর্মী-কাফের হত্যা করাও তাদের দৃষ্টিতে ঈমানী দায়িত্ব। এই “কিউট” জঙ্গীদের প্রতি ক্রাশ খাওয়াও অনেক মেয়ের কাছে ঈমানী দায়িত্ব বলে মনে হতে পারে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঈমানী দায়িত্ব জিনিসটা বড়ই আজব!!!

আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি

05007522

আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জঙ্গীবাদের চারণভুমিতে পরিনত হতে পারে এমন ঝুঁকি পূর্ণ দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান বেশ উপরের দিকে, আপনি স্বীকার করেন কিংবা না করেন এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। জঙ্গীবাদ বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই আছে আমাদের এই সোনার দেশে। এখানে দারিদ্র আছে, আছে সামাজিক বৈষম্য, আছে অশিক্ষা, আছে কুশিক্ষা, আছে সমাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত সাম্প্রদায়ীকতা। ৭১ সালে যে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল সেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদও এখন মুসলিম জাতীয়তাবাদের কাছে হার মেনে কোন রকমে টিম টিম করে জ্বলছে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ধব্জাধার বলে দাবীদার আওয়ামী লীগের মত দলও এখন মুসলিম বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন-“এদেশের মুসলমান এক সময় মুসলমান বাঙালি, তারপর বাঙালি মুসলমান, তারপর বাঙালি হয়েছিলো; এখন আবার তারা বাঙালি থেকে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি মুসলমান থেকে মুসলমান বাঙালি, এবং মুসলমান বাঙালি থেকে মুসলমান হচ্ছে। পৌত্রের ঔরষে জন্ম নিচ্ছে পিতামহ”। মৌলবাদী অর্থনীতিও বাংলাদেশে স্মরণ কালের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিপুল শক্তিশালী এই অর্থনীতির একটা বড় অংশ সরাসরি জঙ্গীবাদী কার্যকলাপে ব্যয় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকাও আসছে দেদারছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম জাকিয়ে বসেছে প্রবলভাবে। বিবর্তনবাদকে অপাংক্তেয় করে রাখা হয়েছে। শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলবাদী লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মৌলবাদী অর্থে গরীব-এতিম ছেলেমেয়েদের জন্য মাদ্রাসার পাশাপাশি, মিডলক্লাস-আপারমিডলক্লাস শ্রেণীর জন্য ইসলামীক কিন্ডারগার্ডেন, ইসলামীক ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। মোট কথা, ইসলামী আইন বা জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যে জনভিত্তি প্রয়োজন তা ইতমধ্যেই দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। দেশের বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষ এখন নীরবে নিভৃতে ইসলামিক ষ্টেটের কার্যকলাপকে সমর্থন করছে। অনৈসলামিক ট্যাগ খাওয়ায় গ্রামাঞ্চল থেকে বাঙ্গালী সংস্কৃতি কেন্দ্রীক উৎসবগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বোরখা-হিজাব ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা দিন দিন বাড়ছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, উনসত্তরের গণঅভ্যুথানে শাড়ি পড়া বাঙ্গালী নারীদের বিক্ষোভের ছবিগুলো দেখি আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। এই ছবি গুলো দেখিয়ে আর আমাদের বর্তমান শহুরে শিক্ষিত মডারেট নারী প্রসঙ্গে প্রশ্নটা করেছিলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক- আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি? উত্তরটা দিতে পারিনি। আসলেই তো, সামগ্রিক ভাবে কি আমরা বলতে পারি স্বাধীনতা পরবর্তী গত ৪৪ বছরে আমরা সত্যিই এগিয়েছি?