শিক্ষা দিবস কি?

আইয়ুব খান ক্ষমতা নিয়েই শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাকিস্তান শিক্ষা বিভাগের সচিব এসএম শরীফকে শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করে একটি কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আইয়ুব সরকার ১৯৬২ সাল থেকে এই রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু করেন।

শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালের ১০ আগস্ট ঢাকা কলেজ ছাত্ররা এক সমাবেশে মিলিত হয়। সে সভায় ১৫ আগস্ট সারাদেশে ছাত্র ধর্মঘট এবং ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সকল কর্মসূচীকে সফল করতে ১৫ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা কর্মসূচী চলতে থাকে। ঢাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন শাসক ১৪৪ ধারা জারি করে ছাত্র ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। অন্যথায় আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করার হুমকি প্রদান করেন। ছাত্ররা ১০ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের ডাক দেয়। হরতাল চলাকালে ও ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিতে নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা, গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লা ও টঙ্গীর শ্রমিক সুন্দর আলী নিহত হন। অনেকে আহত ও গ্রেফতার হন।

গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ৬২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানে ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে শিক্ষানীতি বাতিল ও হত্যার বিচারসহ ছাত্রদের দাবি মানতে ‘চরমপত্র ঘোষণা’ করা হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সামরিক শাসক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন স্থগিত করে। এর পরের বছর ১৯৬৩ সাল থেকে ছাত্ররা ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। তখন থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র সংগঠন এই দিবসটি পালন করে। আজ সেই মহান শিক্ষাদিবস।

শিক্ষা দিবসের গুরুত্ব

শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায়- সেদিনের সেই আন্দোলন ছিল স্বতস্ফুর্ত ছাত্র-জনতার এক প্রতিরোধ আন্দোলন। সেদিনের বিক্ষোভ মিছিলে প্রায় ৯০ ভাগ মেহনতি ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপার থেকে নৌকার মাঝিরা পর্যন্ত বৈঠা হাতে মিছিল অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যে ৪টি আন্দোলন ও কালপর্বকে নির্দিষ্ট করা হয় তার একটি ৬২’র এই শিক্ষা আন্দোলন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর আন্দোলন ও ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এই ৪ প্রধান সংগ্রাম ও ঘটনার পরিণতিই হচ্ছে ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

শরীফ কমিশনের সুপারিশে কি ছিল?

শরীফ কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা সংক্রান্ত সামগ্রিক নির্দেশনা ছিল। শিক্ষার ব্যয়ভার, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠক্রম-পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিস্তারিত উল্লেখ ছিল।

১। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যায়ের শতকরা ৬০ ভাগ ছাত্রদের বেতনের মাধ্যমে আদায় করা, বাকী ৪০ ভাগ স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সরকার প্রত্যেকে ২০ শতাংশ করে এই ব্যয় বহন করবে।

২। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বোৎকৃষ্ট মানের আলেম তৈরীর কাজ করতে হবে।

৩। প্রাথমিক বিদ্যালয়ই হবে অধিকাংশ ছেলে-মেয়ের জীবনের শেষ পর্যায়ের লেখাপড়া।

৪। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পরিচালনায় নিয়ন্ত্রন করা হবে। স্বায়ত্তশাসন বলে কিছু থাকবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে।

৫। সস্তায় শিক্ষা লাভ করা যাবে না, এ কথা জনগণকে পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়।

৬। শিক্ষা হবে ব্যয়বহুল বিশেষত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি ও কারিগরি বিদ্যা। শিক্ষা উন্নয়নের দায়-ব্যয় অভিভাবকদের বহন করতে হবে। সরকারের উপর নির্ভরশীলতা গ্রহনযোগ্য হবে না।

৭। রিপোর্টে বলা হয়, ‘অবৈতনিক শিক্ষার ধারণা, বস্তুত: অবাস্তব কল্পনা মাত্র। শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষা উপকরণ, গৃহ নির্মাণ করতে অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায়ের কথা বলা হয়।

৮। ৫ বছর প্রাথমিক, ৩ বছরে স্নাতক ডিগ্রি কোর্স ও ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের প্রস্তাব করা হয়। উচ্চশিক্ষা পাসের নম্বর ধরা হয় শতকরা ৫০, দ্বিতীয় বিভাগ ৬০ এবং প্রথম বিভাগ ৭০ নম্বর।

৯। শিক্ষকদের ১৫ ঘণ্টা কাজের কথা বলা হয়।

১০। রিপোর্টে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল। কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় শব্দের রুপান্তর ঘটিয়ে ইসলামীকরণ করা হয়। যেমন, ‘কবি নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’-এর ‘নব নবীনের গাহিয়া গান, সজীব করিব মহাশ্মশান’ চরণের সংশোধন করে, লেখা হয় ‘সজীব করিব গোরস্থান। জনপ্রিয় ছড়া, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।’ এটি পরিবর্তন করে করা হলো- ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি সারাদিন যেন আমি নেক হয়ে চলি।’

এক কথায় শরীফ কমিশনের সুপারিশ ছিল গণবিরোধী। প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক, বাণিজ্যিক, বৈষম্যমুলক, গণবিরোধী, শিক্ষা সংকোচন ও অধিকারহীনতার এক নির্লজ্য দলিল।

শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ২২ দফা

তৎকালীন ছাত্রসমাজ এই কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এই নীতিকে বাতিল করতেই বাধ্য করেনি, তারা একটি বিকল্প প্রস্তাবনাও হাজির করেছিল। ১৯৬৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে সকল সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন শাসকের প্রতি ২২ দফার দাবী উত্থাপন করে। এখানে সে দাবীগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। ছাত্রদের সেই ২২ দফার ৫৯ উপদফায় প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার বিস্তৃত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

১. স্কুল পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক পাঠ্যসূচী প্রণয়ন, ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক, কিন্ডারগার্ডেন বাতিল, সারাদেশে একধরণের শিক্ষা চালু করা ২. প্রত্যেক কলেজে উন্নত গবেষণাগার, লাইব্রেরী, ন্যয্যমূল্যে শিক্ষাউপকরণ সরবরাহ ৩. উন্নত প্রকৌশল ও বৃত্তিমুলক শিক্ষা গড়ে তোলা ৪. মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে তোলা ৫. অধিক আসনসংখ্যাসহ কৃষি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, গবেষণার মান বাড়ানো ৬. বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো বিভাগ খুলতে হবে ৭. শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা ৮. নারী শিক্ষার উন্নয়ন ৯. মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা ১০.সামারিক শিক্ষায় সুযোগ বাড়ানো ১১. ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান ১২.ছাত্রবৃত্তি বৃদ্ধি ও শিক্ষা সফরের ব্যবস্থা করা ১৩. শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরকরা ১৪. ছাত্রদের স্বাস্থ্য ও ছাত্রকল্যানের ব্যবস্থা করা ১৫.শিল্পকলা ও সংস্কৃতির চর্চার ব্যবস্থা করা, অপসংস্কৃতি বন্ধ করা ১৬. শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা ১৭. শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো (জাতীয় আয়ের ২৫ ভাগ) ১৮. গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল ১৯.হত্যা-মামলা-নির্যাতন বন্ধ ও বিচার করা ২০. বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন ২১. ২১শে ফেব্রুয়ারী ও ১৭ সেপ্টেম্বরকে সরকারী ছুটি ঘোষণা ২২. প্রধান বিচারপ্রতি বা একজন শিক্ষাবিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য নিয়োগ

বর্তমান প্রেক্ষাপট: শিক্ষার সমস্যা ও সংকট

এতো গেল পরাধীনতার কালের শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকচন গণবিরোধী নীতির আলাপ। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে কেন হাজারো সংকট? শিক্ষার সাম্প্রদায়িকরণ, বাণিজিকীকরণ কি বন্ধ হয়েছে? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তাদের স্বাধীন সত্ত্বা বজায় রাখতে পারছে? সেখানে কি স্বায়ত্বশাসন আছে? মত প্রকাশের অপরাধে শিক্ষকের চাকরি যায়, জেলে যেতে হয়! সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে ধর্মান্ধদের সুপারিশে নাস্তিক ও অন্য ধর্মের লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ হয়নি। বরং আরো সম্প্রসারিত ও বিস্তৃত হয়েছে।

প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।  শিক্ষা উপকরণ, গবেষণাগার, মানসম্পন্ন শিক্ষা, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগারে বই, যোগ্য শিক্ষকের অভাব সর্বত্রই। শিক্ষার্থীরা নোট বই, কোচিং-নির্ভর হয়ে পড়ছে। ভাষার অবস্থা তথৈবচ। শিক্ষা ক্রমেই সনদমুখী হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজ, রাজনীতি, প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা অগ্রসর না হয়ে বরং আরো পশ্চাদপদ হয়েছে।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও ‘পাবলিক’ পরীক্ষা হলেও জরিপ বলছে, ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থবিদ্যামূখী হয়ে পরছে। লেখাপড়া ও পরীক্ষাপদ্ধতি সেকেলেই রয়ে গেছে। নকল কমলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে অহরহই। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাকে ব্যবহার করে শিক্ষাকে উন্নত, সহজলোভ্য, সাবর্জনীন করা হয়নি। দক্ষ জনশক্তি ও কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলতে পারিনি। দেশের আর্থ-সামাজিক ধারা-প্রবনতার সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষাকে গড়ে তুলতে পারিনি।

শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়েনি। যে কারণ এর গুন-মানও বাড়েনি। শিক্ষার তিনধারা বাংলা, ইংরেজি ও ধর্মভিত্তিক তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন ও বিপরীতমূখী। কয়েকটি বাদে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্য ও শিক্ষাসনদ বিক্রী যেন প্রধান উদ্দেশ্য। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যদা ও সম্মান বাড়েনি। বেতন বৃদ্ধির জন্য তাদের পথে নামতে হয়, পুলিশের মার খেতে হয়। ক্ষমতাবানরা স্কুলের জমি, মাঠ দখল করে নেয়, কর্তৃপক্ষ অসহায়। আজ পর্যন্ত একটি কার্যকর, জবাবদিহিমুলক শিক্ষাপ্রশাসন গড়ে ওঠেনি।

‘বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্কুলের শতকরা প্রায় ৯৮ টি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। সরকারী বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬১৬৬টি । এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮৮৫০ টিতে ল্যাবরেটরি আছে, গ্রন্থাগার আছে ৭৮০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি। আরো বলা হয়েছে , ইংরেজি, অংক ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না। শিক্ষকদের মধ্যে আনুমানিক মাত্র ৪৩৫ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত , প্রায় ১ লক্ষ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নাই।‘

আয়-ইনকাম বৈষয়িকতা, ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠাই যেন আমাদের শিক্ষার মূল দর্শন। শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে থাকলেও তা এখনও সুযোগেই রয়ে গেছে। সবমিলে শিক্ষাক্ষেত্রে রয়েছে চরম বিশৃংখলা, সমস্যা ও সংকট।

শিক্ষার এমন সংকট নিয়েই বছর ঘুরে শিক্ষাদিবস আসে। দায়সারাভাবে তা পালিতও হয়। সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনও নীতিকথা আওড়ে যায় কিন্তু শিক্ষার মূল কাঠামোয় মৌলিক কোন পরিবর্তন হয় না। শিক্ষার অধিকারের কথা সংবিধানে লেখা থাকলেও তা আজো আইনী অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

শিক্ষাদিবস কেন জাতীয় দিবস নয়?

বাংলাদেশের সব কিছুই অনুষ্ঠান ও উদযাপনকেন্দ্রীক। কোন কিছুরই প্রকৃত চর্চা ও পালন হয় না। তা ভাষা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র যাই বলি না কেন। ১৯৬৪ সালে সর্বদলের ২২ দফা দাবীর ২১ নাম্বারে উল্লেখ ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারী ও ১৭ সেপ্টেম্বরকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করার। ২১শে ফেব্রুয়ারীকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হলেও, জাতীয়ভাবে উদযাপন হলেও ১৭ সেপ্টেম্বরকে কোন শাসকই আর মনে করেননি। কেন সেটা করা হয় না? সরকারী ছাত্র সংগঠনগুলোও সে দাবী কখনো করেনি। কিন্তু ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহ্য নিয়ে সবাই গর্ব করেন! কিন্তু সেই চেতনা বাস্তবায়নে তাদের কোন ভূমিকা-কর্মসূচী নেই।

৯০এ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফাতেও ছাত্রদের শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছিল। সেটাও  সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু আমরা স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করি। ইতিহাসের এসব রক্তস্নাত গৌরবোজ্জল সংগ্রামের অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়া ও বিস্মৃতির কারণেই ছাত্ররাজনীতি তার আবেদন হারাতে বসেছে।

ক্ষমতাসীনরা কত দিবস পালন করেন কিন্তু শিক্ষাদিবসকে জাতীয়ভাবে পালন করেন না। শিক্ষাদিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন না। অথচ ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তাঁদের অনেক এখন জীবিত আছেন এবং এই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে-মন্ত্রীত্বে আছেন। যারা পল্টন ময়দানে ছাত্র-জনতার সামনে অঙ্গীকার করেছিলেন ১৭ সেপ্টেম্বরকে শিক্ষাদিবস জাতীয়দিবস হিসেবে ঘোষণা করার, তারাও তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। সেটা না করতে পারার কারণ কি শিক্ষার সার্বজনীন আইনী অধিকারের প্রতি দায়বোধ না করা?

শেষ কথা

মধ্য আমেরিকার ছোট দেশ কিউবার বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধ সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার মাঝে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক ও সামাজিক খাতে ঈর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। তার প্রধান কারণ শিক্ষাখাতে তারা অধিক বিনিয়োগ করেছে। শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৯-১০ শতাংশ বিনিয়োগ করছে, আমরা করছি মাত্র ২ শতাংশ। তার ফল তারা পাচ্ছে, বিশ্ব তা বিষ্ময়ে দেখছে। করোনায় এই ছোট দেশ কিউবা তার বিরুদ্ধে অবরোধ করে রাখা ক্ষমতাবানসহ ২০টি দেশে তাদের মেডিকেল টিম পাঠিয়ে, সেবা দিয়ে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছে। এখান থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। বিশ্ব বিপর্যয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যদি ক্ষমতাসীনদের এতটুকু বোধদয় তৈরী করে, তাহলে বাংলাদেশও হতে পারে কিউবার মত এক ব্যতিক্রম উদাহরণ।

—————————————————————————————————

ড. মঞ্জুরে খোদা। লেখক-গবেষক। সাবেক সভাপতি। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

তথ্যসূত্রঃ

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস ১৮৩০ থেকে ১৯৭১, ড. মোহাম্মাদ হান্নান

শিক্ষার সংকট ও উত্তরণের উপায়, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, প্রথম আলো, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

শিক্ষাদিবস কেন জাতীয় দিবসের মর্যাদা পেল না? কাজী ফারুক আহমেদ, দৈনিক যুগান্তর, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শিক্ষাদর্শন ও বাংলাদেশে পাবলিক শিক্ষা, আনু মুহাম্মদ, সাহিত্যসুধা, জুলাই ২০১৫