ধর্ম না মানুষ।
অলিন্দ কে আমি নাস্তিকতা শেখাই নি। মানুষে মানুষে বিভেদ শেখাইনি, ধর্ম বলতে যে কিছু আছে তাও শেখাইনি। ইশ্বরের প্রার্থনা করতে হবে, না, হবে না তাও শেখাই নি। ওকে একপ্রকার ওর মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিলাম।
বাসায় ওর জন্য একটা ল্যাপ্টপ থাকতো। সেইটা দিয়ে ও সারাদিন ইউটিউব দেখতো, গুগল করতো। পুরানো ল্যাপটপ গুলো ওকে দিয়ে দিতাম, তা নিয়ে ও যা খুশি করতো। সাথে একসেট স্ক্রুড্রাইভার কিনে দিয়েছিলাম। তা ব্যবহার করে আমার দুইটা পুরানো ল্যাপটপ, ও পুরোটাই খুলে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। এ কাজগুলো ও একাই করতো।
ইউটিউব ঘাটতো, কোনো জায়গায় আটকে গেলে আমার সাহায্য নিতো। এভাবেই ইউটিউবের উপরে ওর মারাত্মক নেশা তৈরি হয়।
২০১৫ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সকালে, নাস্তার টেবিলে আমি ও অলিন্দ বসে খাবার খাচ্ছি। আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল আস্ট্রোনোমি নিয়ে। ইতিমধ্যে ইউটিউব ঘেঁটে ঘেঁটে সে অনেক কিছু শিখে ফেলেছে। সুপারনোভা ব্ল্যাক হোল, ব্ল্যাকহোল, গ্যালাক্সি, সোলার সিস্টেম, ইউনিভার্স, এমন কি প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কেও তখন তার ভালো ধারণা। এ সব কীভাবে কাজ করে তা সম্পর্কেও সে জানে।
এ সব গল্প করতে করতে হটাৎ সে প্রাণী জগতের ইভালিউশন নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। বাচ্চারা এই সময়টায় প্রচুর প্রশ্ন করে। কিউরিয়াস হয়, তারা অনেক কিছু জানতে চায়। এমন কি জানতে চায় একটা বেবি কীভাবে জন্ম নেয়।
অলিন্দর এ প্রশ্নের উত্তর আমি অনেক দিন এড়িয়ে গেছি। অতঃপর কোনো ভাবেই যখন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারি নি, তখন নিজে ইউটিউব ঘেঁটে ভারতের একটা শিশু সিরিয়ালের এমনই একটা ভিডিও ওকে দেখাই। সেখানে একজন বাবা ঠিক কীভাবে তার একই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে তার নিজ শিশুকে।
ইভালিউশন নিয়ে কথা বলতে বলতে অলিন্দ যে প্রশ্নটা আমাকে করে বসে, তা শুনে সত্যি আমি তাজ্জব বনে যাই। ইশ্বর আছে কী নাই, তা নিয়ে রীতিমতো সে অনুসন্ধিৎসু। আমাকে সে বলেই বসে, জানো বাবা, ইশ্বর বলে কোনো কিছু নাই। এ সব মানুষের বানানো। তার কথা শুনে মুখে আমার খাবার আটকে যায়। ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকি। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি, তোমাকে এ কথা কে বলেছে?
সে নিজের কথার পক্ষে যুক্তি দিতে থাকে। নানাভাবে বুঝাতে থাকে মানুষ তো আগে এমন ছিল, এখন এমন হইছে। এবং শেষ পর্যায়ে বলেই ফেলে, ইশ্বর যদি থাকতো তাহলে বুল্লাও আমার মতো স্কুলে যেতো। বুল্লা যেহেতু স্কুলে যায় না, অন্যের বাসায় কাজ করে। সুতারং এখানে ইশ্বরের থাকার ব্যাপারে সে অনেকটা সন্দিহান। ইশ্বর থাকলে প্রতিটা শিশু বেড়ে উঠতো সমান অধিকারে।
বুল্লা ছিল আমাদের বাসার কাজের মেয়ে। ওকে আমরা কখনই কাজের মেয়ে হিসেবে চিন্তা করি নি। ছোট বোনের মতোই দেখতাম। সবকিছু দেওয়ার পরেও সে যে স্কুলে যায় না, এই প্রশ্নটাই সে অনেকবার বুল্লাকে করেছে, কেনো সে স্কুলে যায় না? কেনো সে তার মতো পড়ালেখা করে না?
মেয়েটা অনেক বুদ্ধিমান ছিল। সেই মূলত অলিন্দকে কম্পিউটারে ইউটিউব চালানো, গুগল করা শেখাতো। দুইজন বসে বসে যখন এই সব ভিডিও দেখতো, তখন একটা পর্যায়ে অলিন্দ মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করে, ইশ্বর কী আসলেই নেই? মেয়েটা ওকে যে উত্তর দিয়েছিল, তা ওর হৃদয়ে গেঁথে যায়। দেখো, ইশ্বর যদি আদও থাকতো, তাহলে তোমার মতো আমিও আজ স্কুলে যেতাম, পড়ালেখা করতাম। আমারও বাবা থাকতো, মা থাকতো। তারা আজ থেকেও নেই।
অলিন্দর মধ্যে তখন থেকেই ধর্মের ব্যাপারে অনেকটা অনিহা চলে আসে। স্কুলের ধর্ম বই সে পড়তে চাইতো না। ফলে স্কুলের শিক্ষকের কাছে অনুরোধ করেছিলাম ওকে মোড়াল সাইন্স দিতে। তারা রাজী হয় নি। যে কোন লম্বা পাঞ্জাবি পায়জামা পরিহিত দাড়িওয়ালা হুজুর দেখলেই অলিন্দ ফিক করে হেসে দিত। না, এ সবের কোনো কিছুই আমি শেখাইনি। একই দেশের মধ্যে কিছু মানুষ তাদের কে আলাদা করে নেওয়ার জন্য আলাদা ধরণের পোষাক পরছে, এই ব্যাপারটাই তার মাথায় কাজ করেছে বারবার।
ওর বেড়ে ওঠার প্রথম চার বছর আমি দেশেই ছিলাম না। তাহলে ছেলে কেনো নাস্তিক হয়ে বেড়ে উঠলো? এর কারণ আমি তাকে ওর নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে দিয়েছিলাম। ওকে ওর মতো করে চিন্তা করার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। ওর মাথার মধ্যে আমার চিন্তাভাবনা ঢুকিয়ে দেই নি। ওর অপারেটিং সিস্টেম কী হবে তা ও নিজেই পছন্দ করে নিয়েছে। অবশ্য যারা জানে না এই বিষয় গুলো, তারা ভাবে এ সব আমি ই তাকে শিক্ষা দিয়েছি।
আদতে এ সব ও নিজেই শিখেছে।
আমি শুধু ওকে পছন্দ করে নেওয়ার অধিকার টুকু দিয়েছিলাম। ও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতে জানে না। প্রাণীদের কে প্রচন্ড ভালোবাসে। তিন বছর বয়সে যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, তখনই ব্রেকের খাবার নিজে না খেয়ে রাস্তার কুকুর গুলোকে খাওয়াত। তাদের কে ধরে বাসায় নিয়ে চলে আসতো।
ধর্মের ব্যাপার আসলেই সে এড়িয়ে যায়। কালো মানুষ দেখলে কিছুটা বিরক্ত হয়, শুধু আমি ছাড়া। ওকে আমি বুঝাই, বাবা, কালো মানুষরাও মানুষ। ওদেরও একজন সাদা মানুষের মতো মন থাকে, শিরা উপশিরায় প্রবাহিত রক্তের রঙ ওদেরও লাল হয়। এই যে সাদা আর কালো, এই পার্থক্য মেলানিনে।
কিছু দিন আগে অলিন্দ যখন আমাকে বলে, বাবা, জানো মানুষই এ পৃথিবীর সবচে নিকৃষ্ট প্রাণী এবং তারা কেনো সবচে নিকৃষ্ট প্রাণী তার পক্ষে সে যুক্তিও দিয়েছিল। আমি তার প্রতিটা যুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণ এ পৃথিবীর ইমিউনিটি সিস্টেম কে সভ্যতার নামে মানুষ যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ করেছে অন্যান্য সকল প্রাণী মিলেও তার ধারে কাছে নাই। বরঞ্চ অন্যান্য প্রাণীরা ইকো সিস্টেম কে বাঁচিয়ে রাখে যা মানুষ প্রতিটা মুহুর্তে ধ্বংস করছে।
শিশুদের কে বেড়ে উঠতে দেওয়া উচিৎ তাদের নিজেদের মতো করে। পড়ালেখার নামে প্রেশার কুকারে ঢুকিয়ে দিয়ে শৈশব নষ্ট করার অধিকার কোনো বাবা মায়ের নাই। তারা ভুলে যায়, তাদের নিজেদের প্রয়োজনে একটা শিশু পৃথিবীতে আসে, শিশু তার নিজের প্রয়োজনে আসে না। একটা শিশুর ভবিষ্যৎ আচার আচরণ বা ব্যবহার কেমন হবে, তা সম্পূর্ণরুপে নির্ভর করে পরিবার বা সমাজ থেকে সে কী শিক্ষাটা পেয়েছে তার উপর।
আসলে শিশুদের শৈশবের বেশিরভাগ সময়টা কেটে যায় তার নিজ বাসায় বা বাড়িতে। যার ফলে পরিবারের শিক্ষাটা স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে দাঁড়ায় তার পরবর্তী জীবনে। পরিবার থেকেই সে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ শেখে, ধর্মের জাঁতাকলে পিষ্ঠ হতে থাকে। একজন শিশুর মধ্যে শেখানো হয়, পিঁপড়াদেরও ধর্ম আছে। অথচ প্রাণীদের মধ্যে সবচে জটিল যে টেকনোলোজি ব্যবহার করে তা এই পিপীলিকা। শিশুকে এ কথা কেউ ই শেখায় না।
প্রাণী জগতে পিপীলিকা সবচে বেশি আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার করে। এমন কি তা মানুষের টেকনোলজির চেয়েও আধুনিক টেকনোলজি। তারা প্রায় একলাখ বছর আগেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সবচে কঠিন স্তর পাড় করে এসেছে। তাছাড়া, যোগাযোগের জন্য যে কমিউনিকেশন সিস্টেম তারা ব্যবহার করে, তা অর্জন করতে মানুষকে আরও কয়েক শত বছর অপেক্ষা করতে হবে।
সুতারং একজন শিশুকে ধার্মিক বানানোর আগে তার পরিবার কে মানুষ বানানোর শিক্ষা দেওয়া উচিৎ। যে মানুষ গুলো গত কয়েক দিনে মারা গেলো বা খুন হইল, তারাও এক সময়ে শিশু ছিল। যারা মারলো, তারাও শিশু ছিল। অথচ শৈশবে তাদের শিক্ষাটা ছিল ভিন্ন।
একটু খেয়াল করলে দেখবেন, মুসলমান প্রধান রাষ্ট্র গুলো জ্ঞান বিজ্ঞানে এতো পিছিয়ে আছে কেনো?
তাদের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণই হচ্ছে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ধর্ম। তাদের ধর্মই তাদের কে শিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞান ও মানবিকতার যে মাপকাঠি গুলো আছে, সব কিছু থেকে পিছিয়ে রাখতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
মুসলমান পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন শিশু শৈশব থেকেই মনে হিংসা নিয়ে বেড়ে ওঠে। তাদের মগজের মধ্যে ভাইরাস হিসেবে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, মানুষ হিসেবে তারাই শ্রেষ্ঠ। অথচ মানবিকতার মাপকাঠি গুলো দিয়ে তাদের কে পরিমাপ করতে গেলে, আমার কাছে তারা সবচে নিকৃষ্ট বলে পরিগণিত হয়।
ধর্ম তাই আমার কাছে এক প্রকার অপ্রয়োজনীয় একটা বিষয়। যে জিনিস মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে, তা কখনই ফলপ্রসূ হতে পারে না, ভালো কিছু হতে পারে না। সমাজের জন্যে ভালো কিছু দিতে পারে না। রাষ্ট্রের বেলায় আসলে তো কথাই নেই। সুতারং শিশু আপনার, পছন্দও আপনার। তাকে মানুষ বানাবেন, না জঙ্গি।