পর্ব-১

 

ইসলাম ধর্মের জন্ম ও বিকাশ নিয়ে অমুসলিম’রা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আলী সিনার ভাষ্যমতে, হযরত মুহাম্মদ টেম্পোরাল লোব এপিস্টেসি তে আক্রান্ত  ছিলেন। আলবার্টা রিভেরার মতে, ইসলাম ধর্ম আদতে রোমান ক্যাথলিক চার্চ জেরুজালেম দখলের উদ্দেশ্যে বানিয়েছিল, কিন্তু পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

কেউ আবার আলী দস্তির মতো মনে করেন আলেক্সান্ডার, নেপোলিয়ান, চেঙ্গিস খান, লেনিন প্রমুখের মতো হযরত মুহাম্মদও একজন উচ্চাকাঙ্খী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, যিনি ব্যক্তিগতভাবে আরবের ধর্ম ও সমাজ সংস্করণের তাড়না থেকে তাঁর অগ্রযাত্রা শুরু করেন। ইউসেফ হাদ্দাদ, আবু মুসা আল হারারি প্রমুখ খৃষ্টান গবেষকদের ধারণা ওয়ারাকা বিন নওফেল একটা প্রাচীন ফির্কার খৃষ্টধর্ম  প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত মুহাম্মদ কে গড়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর মুহাম্মদ তাঁর উদ্দেশ্য পাল্টে ফেলেন ও ওয়ারাকার কাছ থেকে পাওয়া আব্রাহামিক কিতাবাদির জ্ঞান দিয়ে নিজেকে একজন সফল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গড়ে তোলেন।

কিন্তু এ সকল ব্যাখ্যায় কমবেশি ফাটল আছে। হযরত মুহাম্মদের রহস্য উদঘাটন করার বেলায় ইসলামের জন্মের সময়কার আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরীণ ও আন্তজার্তিক রাজনীতির বিষয়টা তেমন কেউ বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। পশ্চিমা একাডেমিকেরা যদিও এ সংক্রান্ত কিছু গবেষণাকাজ করেছেন। কিন্তু সেগুলোর সাথে সাধারণ পাঠকদের  একেবারেই পরিচিতি নেই। সে সময়ের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির ঘটনাবলি আর নবী মুহাম্মদের জীবনী সমান্তরালে রেখে দেখলেই আমার মনে হয় সব পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।

হযরত মুহাম্মদ ঠিক সেই সময়ে নবী হয়ে ওঠেন, যে সময়ে তৎকালীন দুই পরাশক্তি পূর্ব রোম ওরফে বাইজ্যান্টিয়াম ও পারস্যের মধ্যে শেষ প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধটা সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বাইজ্যান্টিয়াম আর পারস্যের শান্তিচুক্তি হয়ে গেলেও এই দীর্ঘ ২৬ বছরের যুদ্ধের বড় একটা সময় জুড়ে বাইজ্যান্টাইন দের শোচনীয় অবস্থা ছিল।

এমন এক সময়ে হযরত মুহাম্মদের নবী হয়ে ওঠা, একজন খৃষ্টান যাজকের (ওয়ারাকা বিন নওফেল) প্রথম তাঁকে নবী হিসেবে শনাক্ত করা [1], সেই যাজকের আবার আবিসিনিয়ার সম্রাটের দরবারে আনাগোনার ঘটনা ইতিহাসে থাকা [2], বাইজ্যান্টিয়ামের মিত্ররাজ্য আবিসিনিয়ার সম্রাটের মুসলিমদেরকে আগ্রহের সাথে সহযোগিতা করা, সূরা আর-রুম (কোরান, ৩০) নাজিল হওয়া যেখানে কোরানের আল্লাহ্ স্পষ্ট অগ্নিউপাসক পারস্যের বিরুদ্ধে বাইজ্যান্টাইনদের পক্ষ নিয়েছেন, ৬১৫-৬১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হযরত মুহাম্মদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মানো যে উনার জন্য কিসরা ও কায়সার এর ধনভান্ডার (মুহাদ্দিসগণের মতে ইরাক ও সিরিয়া [3]) উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে- এ ঘটনা গুলা কি আদৌ বিচ্ছিন্ন ছিল?

হযরত মুহাম্মদের স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ এর আপন চাচাতো ভাই উসমান বিন আল হুয়াইরিস এর বাইজ্যান্টাইন সম্রাটের পক্ষ থেকে মক্কার ভ্যাসাল কিং হতে আসার ও মক্কাবাসীর উপর খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হবার [4] কয়েক বছর পর সেই উসমানের ই পরিবারবর্গের দ্বারা হযরত মুহাম্মদের নবুয়তের নিশ্চয়তা পাওয়া, জেনারেল হিরাক্লিয়াস ৬০৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ করে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে বাইজ্যান্টিয়ামের সম্রাট হলে সে বছরই হযরত মুহাম্মদের কাছে প্রথম ওহী আসা, ৬১৪ খ্রিস্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের  আরব ফ্রন্ট গ্রেটার শাম পারস্যের দখলে চলে যাবার কয়েক বছর পর থেকে হযরত মুহাম্মদের প্রকাশ্যে “আমাকে আরব ও আজমের চাবি দেওয়া হয়েছে” এমন কথা জোর দিয়ে বলতে শুরু করা, ৬২২ খৃষ্টাব্দে হিরাক্লিয়াসের নতুন উদ্যোমে যুদ্ধে যাওয়ার বছরেই হযরত মুহাম্মদেরও মদীনায় হিজরত করা, কোরানের শহীদ ও গাজীর মর্যাদার ধারণার সাথে হিরাক্লিয়াস এর ঘোষণা করা “Crown of martyrdom”

অর্থাৎ পারস্যের সাথে যুদ্ধে যে সকল রোমান খৃষ্টান সৈনিক শহীদ হবেন তাদের জন্য উঁচু দরের সম্মাননার প্রলোভনের ব্যাপারটার বিস্ময়কর রকমের সাদৃশ্য [5], হযরত মুহাম্মদের সংগ্রামটা যেমন ছিল পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তেমনি হিরাক্লিয়াসেরও পারস্যের বিরুদ্ধে নিজের যুদ্ধকে “পৌত্তলিক ও মূর্তিপূজক দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বলে ঘোষণা দেওয়া [6], যেই ইহুদী গোত্রগুলো এক কালে মদীনার উপকণ্ঠের ভূমি থেকে খাজনা উঠিয়ে পারস্যের হাতে দিত (বনু কুরায়জা ও বনু নাদির) [7] সেই গোত্রগুলোকেই শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতি বরণ করতে হওয়া, হিরাক্লিয়াস ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে তুর্কীদেরকে পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দিলে ঐ বছরই হুদায়বিয়ার সন্ধি করে এসে খোস্রু পারভিজ কে হযরত মুহাম্মদের চিঠি পাঠিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে আত্মসমর্পন করার আহবান জানানো- এ ব্যাপারগুলা কি নিছক কাকতালীয় ছিল?

যদি কাকতালীয়ই হয়, তাহলে কেনো বদরের যুদ্ধের পর আবিসিনিয়ার সম্রাট (নাজাশী) এতো টাই খুশি হলেন যে পুরানো কাপড় গায়ে ফরাশ ছাড়া মাটিতে বসে ছিলেন? অতঃপর জাফর ইবনে আবু তালিব তাঁর এ অবস্থা দেখে অবাক হয়ে এর কারন জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বলেন যে, “তোমাদের দেশ থেকে আমার এক গুপ্তচর এসে বলেছে যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে সাহায্য করেছেন” [8]। কেনো একজন খৃষ্টান রাজ্যের রাজা এভাবে গুপ্তচর লাগিয়ে তদারকি করছিলেন নবী মুহাম্মদের কাজ?

আবিসিনিয়া আবার বাইজ্যান্টাইনদের পরম মিত্র ও অনুগত রাজ্য ছিল। আবিসিনিয়ার মাধ্যমে বাইজ্যান্টিয়াম চেষ্টা করতো আরবীয় উপজাতিগুলোকে তাদের প্রভাবে এনে পারস্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে [9]

খন্দকের যুদ্ধের সময় নবী মুহাম্মদ দাবি করেছিলেন যে, উনাকে সিরিয়া, ইরাক আর ইয়েমেন রাজ্যের চাবি দেওয়া হয়েছে [10]। এখানেও কাকতালীয়ভাবে দেখা যায়, এ জায়গাগুলোয় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল হিরাক্লিয়াস ও নাজাশী উভয়েরই। কারন সিরিয়ায় রোমানদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চরম দুর্বল ছিল, ইরাক ছিল বাইজ্যান্টাইন আর পারসিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী বর্ডার। পারসিয়ানদের বাইজ্যান্টিয়ামে যেতে হলে ইরাক অতিক্রম করেই যেতে হতো। আর ইয়েমেন তখন ছিল পারস্যের দখলে।

৫৭০-৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৫ বছর আবিসিনিয়া আর পারস্যের মধ্যে যুদ্ধ চলার পর ইয়েমেন পারস্যের অধীনে যায়। ইয়েমেন ছিল এডেন উপসাগরের উপকূলবর্তী দেশ। আর মেডিটেরিয়ান জগত এবং আবিসিনিয়ানদের বাণিজ্য জাহাজগুলোকে ভারতবর্ষে যেতে হলে এডেন উপসাগর হয়েই যেতে হতো। সিল্ক রুটে পারস্য চড়া খাজনা বসিয়ে রেখেছিল রোমানদের জন্য। এডেন উপসাগরেও পারস্যের জলদস্যুর উৎপাত শুরু হলে সেটা কি ভালো খবর হতো রোম আর আবিসিনিয়ার জন্য?

 

 

                                                          The World of Late Antiquity

 

ইসলামপূর্ব আরবের সমগ্র ভূরাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে ইতিহাসবেত্তা হিট্টি বলেন, “খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী আরবরা ছিল বাইজ্যান্টাইনপন্থী এবং নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকার স্বার্থে তারা কন্সট্যান্টিনোপল এর সাহায্যের প্রত্যাশায় ছিল। ইহুদী ও প্যাগান ধর্মাবলম্বী আরবরা ছিল পারস্যপন্থী এবং টেসিফনের কাছ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করতো।” এছাড়া তিনি আরো বলেন, “বাইজ্যান্টিয়ামের প্রতি দেশীয় খৃষ্টান আরবীয়দের সহানুভূতি আবিসিনিয় হস্তক্ষেপ এর অনুকূলে একটি গোঁজ হিসেবে কাজ করেছিল। আবার পারসীয়দের প্রতি ইহুদী ও প্যাগান ধর্মাবলম্বীদের সহানুভূতি পারস্যকে বিশেষ সুযোগ এনে দিয়েছিল।” [11] 

 

পুনশ্চ – এই আশানুর আসলে সেই আশানুর না। এই আশানুর আসলে আরেকজন, যার নাম আপাতত উহ্য থাকলো। সময়ের প্রয়োজনে তা করা যাচ্ছে না, একদিন হয়তো তা প্রকাশ হবে। সময়ের প্রয়োজনেই প্রকাশ হবে।

 

তথ্যসূত্র:

 

[1] বুখারী, খন্ড-১, অধ্যায়-১, হাদিস নং-৩।

[2] আল বিদায়া ওয়া নিহায়া, খন্ড-২, পৃষ্ঠা- ৫৫২।

[3] মিশকাত ৫৭৫০ এর ব্যাখ্যা, মানঃ সহীহ।

[4] Michael Lecker, The Monotheistic Cousins of Muhammad’s Wife Khadija

[5] Tommaso Tesei, Heraclius’ War Propaganda and the Qurʾān’s  Promise of Reward for Dying in Battle.

[6] Walter E. Kaegi, Heraclius Emperor of Byzantium.

[7] Michael Lecker, The Levying of Taxes For The Sassanians in Pre-Islamic Medina.

[8] আল বিদায়া ওয়া নিহায়া, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৩৪।

[9] ফিলিপ কে. হিট্টি, আরবজাতির ইতিহাস, পৃষ্ঠা- ৬৪।

[10] আল বিদায়া ওয়া নিহায়া, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ১৯৬।

[11] হিট্টি, পৃষ্ঠা- ৬৮।