যখন বৃষ্টি এলো

 

গত কিছুদিনে গান নিয়ে এতো বেশি লোকজনকে জ্বালিয়েছি যে, ভেবেছিলাম আগামী ছয়মাস আর গান সংক্রান্ত কোন পোষ্ট দেবো না। নির্লজ্জ্বের মত সেই ভাবনাকে শিকেয় তুলে রেখে আবারো গান নিয়েই পোস্ট দিলাম। মুক্তমনায় আস্তিকতা- নাস্তিকতা নিয়ে যে উত্তপ্ত অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাকে সুশীতল করার আর কোন উপায় পেলাম না গান বাজনা শোনানো ছাড়া। এটা দিয়ে কিছুটা হলেও যদি লোকজনের মনযোগ বিতর্ক থেকে সরিয়ে দিতে পারি তাহলেও খুব একটা মন্দ হয় না। কী বলেন আপনারা?

 

আসুন গান শুনি, গান নিয়ে আলাপ আলোচনা করি, জীবনকে হালকাভাবে নেই। একটাই মোটে জীবন আমাদের। বৃথা তর্কে সেটাকে অপচয় করার কোন মানে আছে নাকি?

 

মধ্য সত্তরে এই নামে একটা চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল বাংলাদেশে। তুমুল আলোড়ন তুলেছিল সেই চলচ্চিত্রটি। মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ওয়াসিম এবং অলিভিয়া। পরিচালনায় অথবা প্রযোজনায় ছিলেন অলিভিয়ার স্বামী এস, এম শফি। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই ছবিটির একটি দৃশ্যও এখন আমার মনে নেই। এমনকি ছবিটি টিভিতে দেখেছি, না হলে গিয়ে দেখেছি তাও মনে নেই আমার। এত ছোটবেলায় দেখেছি যে এর কিছুই মনে পড়ছে না।অবশ্য ছোটবেলার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে খুব একটা লাভ নেই। কারণ খুঁজে পেতে দেখলাম যে এর আগে ঘটে যাওয়া চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়কার অনেক ঘটনাই মনে আছে আমার। অবশ্য ছবিটার কিছুই মনে নেই বললে আসলে ভুল হবে। আবছাভাবে মনে পড়ে যে অলিভিয়া বিস্তৃণ কোন প্রান্তরে দোপাট্টা উড়িয়ে উড়িয়ে গান গাইছে। তবে এরকম দৃশ্য সত্যি সত্যি ওই ছবিতে ছিল, নাকি আমার উর্বর মস্তিষ্ক নিজে নিজেই তার ছোট্টবেলার ভালবাসার অলিভিয়াকে তৈরি করে নিয়েছে, সেকথা হলফ করে বলতে পারবো না।

 

তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে, চলচ্চিত্রটির কোন দৃশ্য মনে না পড়লেও এর বেতার বিজ্ঞাপনের অনেক কিছুই মনে আছে আমার। ছবিটির মূল নাম ছিল দ্য রেইন। বাংলা সিনেমার সংলাপে যেমন অভিনেতা অভিনেত্রীরা কোন ইংরেজী বাক্য বলে সাথে সাথে এর অনুবাদও করে দেয়, সেরকম  বেতার বিজ্ঞাপনে দ্য রেইন বলেই এর সাথে সাথে বলা হতো যখন বৃষ্টি এলো। আমি অবশ্য এখনো জানি না যে  কী কারণে এতো সুন্দর একটা বাংলা কাব্যিক নাম বাদ দিয়ে দ্য রেইন নামে ছবিটির নামকরণ করা হয়েছিল। অবশ্য যেটুকু বুঝেছিলাম ওই বেতার বিজ্ঞাপন থেকে তাতে মনে হয় বিদেশে ছবিটি চালানোর জন্য এর নামকরণ ইংরেজীতে করা হয়েছিল। এই ছবিটি নাকি একই সঙ্গে বিদেশেও মুক্তি পেয়েছিল। তখন শুনেছিলাম যে এই ছবির দুটো ভার্সন। বিদেশে চালানোর ভার্সনটিতে নাকি একটু বড়দের ঝাঁল মসলা যুক্ত ছিল। সত্যি মিথ্যা জানি না। বাংলাদেশি ভার্সনটাই আর দেখা হয়নি কখনো, বিদেশী ভার্সনতো বহু দূরের কথা।

 

অলিভিয়ার স্বামী এস, এম শফি খুব চটকদার ধরনের মানুষ ছিলেন। সবকিছুতেই চমক ছড়ানো ছিল তার অভ্যাস। একবার আন্তর্জাতিকভাবে মাসুদ রানা ছবি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। সেই ছবির জন্য নিদেনপক্ষে পাঁচফুট আট-দশ ইঞ্চি উচ্চতার নায়ক খোঁজার জন্য সেকি তোড়জোড় তার। পত্রপত্রিকায় মাসুদ রানার জন্য চটকদার বিজ্ঞাপন ছাপা হত তখন। মাসুদ রানা হয়ে অলিভিয়াসহ আরো অনেকগুলো দেশের সুন্দরী নায়িকাদের বক্ষলগ্না করার উন্মুক্ত আহবান ছিল সেই বিজ্ঞাপনে। আমাদের পাড়ার দুই একজন লম্বু সুদর্শন মাস্তানও তাদের ছবি পাঠিয়ে দিয়েছিল মাসুদ রানা হবার আশায়। একটু বেশি ছোট ছিলাম বলে অলিভিয়ার সাথে অভিনয়ের এমন বিরাট সুযোগটা মিস হয়ে গিয়েছিল আমার। বড়ই আফসোস!!

 

দ্য রেইন ছবিটা আসলে কী রকম ছবি ছিল? চটুল ধরনের পোশাকী ছবি? নাকি সুস্থ বিনোদনমূলক ছবি? নাকি সিরিয়াস কোন চলচ্চিত্রি? কেউ কী জানেন এই বিষয়ে কিছু? অনেক চেষ্টা করলাম ইন্টারনেটে এই চলচ্চিত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের। কিছুই পেলাম না। ওয়াসিম আর অলিভিয়া এই চলচ্চিত্রে আছে বলে ধারনা করে নিচ্ছি যে চটুল ধরনের ছবি ছিল সেটা। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে এই ছবিতে অসাধারণ কিছু উন্নত মানের গান আছে। একটা চটুল পোশাকী ছবিতে এত উন্নত ধরনের কাব্যময় গীতি থাকে কী করে? এত কাব্যিক নামই বা হয় কী করে সেই ছবির?

 

বাংলাদেশে প্রতিবছর চলচ্চিত্রের গানের ক্ষেত্রে নারী কণ্ঠে গাওয়া এবং পুরুষ কণ্ঠে গাওয়া এই দুই ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে এই দুই ক্যাটাগরিতে জিতে নেয় দ্য রেইন ছবির দুটো গান। এর একটি ছিল রুনা লায়লার গাওয়া চঞ্চলা হাওয়ারে। আর অন্যটি ছিল মাহমুদুন্নবীর গাওয়া আমিতো আজ ভুলে গেছি সবিগানটা। সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন আনোয়ার পারভেজ।

 

আমার মতে রুনা লায়লার গাওয়া সেরা তিনটি বাংলা গানের এটা একটি। আমার সেরা পছন্দ হতে বাধা শুধু মাত্র যখন থামবে কোলাহল আর গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে গান দুটি। এখনো নিশ্চিত নই কোনটি আমার বেশি পছন্দের গান। তবে আমার মনে হয় খুব চুলচেরা করে বিশ্লেষণ করলে বাকী দুটোকে ফটোফিনিশিং এ পরাস্ত করে এটিই চলে আসবে এক নম্বরে। এই গানে যখন রুনা ঘুমন্ত বন্ধুকে ছায়া দেবার জন্য মেঘকে আয়রে মেঘ বলে ডাক দেয়, আমার মনে হয় যেন সত্যি সত্যি মেঘ এসে হাজির হচ্ছে সেই আকুল আবেদন শুনে। এতই জীবন্ত এই গান!

 

 

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

 

একমাত্র গীতা দত্তকে বাদ দিলে (গীতা দত্ত ফরিদপুরের মেয়ে) রুনার মত এরকম অসাধারণ কণ্ঠশৈলী নিয়ে বাংলাদেশে আর কোন শিল্পী মনে হয় না জন্মেছে। অদ্ভুত একধরনের মাদকতা আছে তার কণ্ঠে। অথচ তার কণ্ঠের এই মাদকতাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সঙ্গীত পরিচালকেরা চটুল গানের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছেন বেশি। ফলে রুনা লায়লা যত না সংখ্যক ভাল গান গেয়েছেন, তারচেয়ে দশগুণ বেশি সংখ্যক গেয়েছেন চাকভুম চাকভুম চাঁদনী রাতে, রূপে আমার আগুন জ্বলে বা ও পানিরে পানি তোর মতলব জানি ধরনের আজে বাজে গান।

 

শৈশব এবং কৈশোরে বাবা মায়ের সাথে করাচীতে থাকতেন রুনা লায়লা। মাত্র বারো বছর বয়সে উর্দু চলচ্চিত্রে প্লে ব্যাক করে চলচ্চিত্রের গানে পদার্পন করেন। এর আগে আরো পিচ্চি বয়সেই স্টেজ মাতিয়ে ফেলেছেন তিনি। বড় বোন দীনা লায়লা তখন গানের শিল্পী হিসাবে বেশ নাম ডাক করে ফেলেছেন। এক অনুষ্ঠানে তার অসুস্থতার কারণে পিচ্চি রুনাকেই দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় গান গাইবার জন্য। তারপর থেকেই বিশ্বকে জয় করে নেন তিনি। অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পী দীনা লায়লা অকালে ক্যান্সারে মারা যান। আপনারা জানেন কিনা জানিনা না। মিরপুরে দীনা লায়লার নামে একটি সঙ্গীত একাডেমি আছে।

 

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন রুনা। পাকিস্তানে এবং বোম্বেতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকার পরেও বাংলাদেশকেই বেছে নেন তিনি। ফিরে আসার আগে এবং পরেও পাকিস্তানে প্রচুর গান গেয়েছেন তিনি। ইউটিউবে রুনা লায়লা নাম দিয়ে সার্চ দিলে অবাক হয়ে যাবেন। রুনার যতগুলো না বাংলা গান আসবে তার প্রায় দশগুণ বেশি আসবে উর্দু গান ।

 

শৈশব এবং কৈশোর পাকিস্তানে কাটানোর কারণে বাংলা লিখতে এবং পড়তে পারেন না তিনি। যে কোন গান গাইবার আগে সেটাকে রোমান হরফে লিখে দিতে হয়। আর তা দেখে  পড়েই গান গান তিনি। একবার কবি শামসুর রাহমানের লেখা একটি দেশাত্মবোধক গানের রিহার্সালের সময় কবি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যখন দেখলেন যে সঙ্গীত পরিচালক তার গানকে রোমান হরফে লিখে দিচ্ছে তখন হতাশায় একেবারে মুষড়ে পড়লেন তিনি। সঙ্গীত পরিচালককে একপাশে ডেকে নিয়ে বললেন যে, এ কাকে ধরে নিয়ে এলেন গাইবার জন্য। এতো বাংলাই পড়তে পারে না। গাইবে কী করে। সঙ্গীতকার আশ্বস্ত করে বললো যে ভাবনেন না কিছু। আগে গানটা করুক, পরে দেখুন কেমন লাগে। কবি অবশ্য গান শোনার আর সাহস পাননি। ভাঙ্গা মন নিয়ে বাড়ীতে চলে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য রুনার কণ্ঠে গান শুনে চমকে গিয়েছিলেন তিনি।

 

গান যে শুধু শোনার জিনিষ নয় দেখারও তার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তিনি। স্টেজ শোতে রুনা লায়লা অনন্য। তার ধারে কাছে যাবার মত আর কেউই নেই। অপূর্ব কণ্ঠশৈলী ছাড়াও তার দারুণ সৌন্দর্য, চমৎকার ফ্যাশন সচেতনতা, ছন্দময় সাবলীল নাচ এবং দর্শকদের সাথে যোগাযোগের অসাধারণ ক্ষমতার কারণে স্টেজে উঠলেই মাতিয়ে দিতে পারেন তিনি।

 

প্রকৃতির কোন এক বিচিত্র খেয়ালে আমরা আমাদের সর্বকালের সেরা তিন নারী কণ্ঠকে পেয়ে গিয়েছি একই সময়ে। এই সেরা তিন কণ্ঠের অন্য দুজন হচ্ছেন সাবিনা ইয়াসমিন আর শাহনাজ রহমতুল্লাহ। সাবিনা যে পরিমাণ জনপ্রিয় গান গেয়েছেন, তা আর মনে হয় না অন্য কেউ গাইতে পারবে। অন্যদিকে শাহনাজ গুণে এবং মানে যে  পরিমাণ দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন তা রীতিমত বিস্ময়কর। দেশের গান যে কণ্ঠ দিয়ে নয় হৃদয় দিয়ে গাইতে হয় সেটার যথার্থ প্রমাণ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। আমার এক পাকিস্তানী বন্ধুর কাছে শুনেছি যে, এখনো নাকি পাকিস্তানে রুনা লায়লা এবং শাহনাজ রহমতুল্লাহর ( ওরা অবশ্য শাহনাজ বেগম নামে চেনে) জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।

 

বাংলাদেশে রোমান্টিক গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী মাহমুদুন্নবী। এরকম রোমান্টিক গানের গলা নিয়ে তার আগেও যেমন কেউ বাংলাদেশে জন্মায়নি, পরেও না। পশ্চিম বাংলায় হেমন্ত যেমন, বাংলাদেশে মাহমুদুন্নবী তেমনই। আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন, গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে, তুমি যে আমার কবিতা, ওগো মোর মধুমিতার মত অসংখ্য রোমান্টিক গান গেয়েছেন এই শিল্পী। ষাট এবং সত্তর দশকে যে কোন রোমান্টিক গান হলেই সঙ্গীত পরিচালকদের প্রথম পছন্দ ছিল মাহমুদুন্নবী।

 

আজকের জনপ্রিয় শিল্পী সামিনা চৌধুরী এবং ফাহমিদা নবীর বাবা ছিলেন তিনি। তার দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদে নবী পদবী ত্যাগ করেছিল দুবোনই। ইদানিং অবশ্য ফাহমিদাকে দেখছি নবী পদবী আবার ব্যবহার করতে।

 

রুনা লায়লার ক্ষেত্রে চঞ্চলা হাওয়ারে যেমন ফটো ফিনিশিং এ প্রথম হয়েছিল, মাহমুদুন্নবীর ক্ষেত্রে সেরকম নয়। আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন, গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বা তুমি যে আমার কবিতার মত অসাধারণ গানগুলোকেও অনেকখানি পিছনে ফেলে দিয়ে আমার কাছে মাহমুদুন্নবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হচ্ছে আমিতো আজ ভুলে গেছি সবি।

 

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

 

আপনাদের জন্য এটা একটা বোনাস বলতে পারেন। রুনা লায়লা তার তেরো বা চৌদ্দ বছর বয়সে পাকিস্তান টেলিভিশনে সরাসরি গান গাইছেন। রুনার কিশোরী বয়সের এই ভিডিওটা যতবারই দেখি ততবারই গর্বে বুকটা দশ হাত উঁচু হয়ে যায় আমার। এই না হলে কী আর  রুনা লায়লা। গানটার কিছুই বুঝি না আমি। তাতেও কিছু এসে যায় না। গাইছে যে আমাদেরই রুনা। আমি নিশ্চিত। আপনাদেরও গর্বে বুক ফুলে উঠবে এটা দেখার পরে।

 

httpv://www.youtube.com/watch?v=lJq1K-N5AEw